ব্রিটেনে সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারের নতুন দিগন্ত: পোস্ট কমছে, দেখছে বেশি
আজকের ডিজিটাল যুগে সোশ্যাল মিডিয়া আমাদের দৈনন্দিন জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। বন্ধু-বান্ধব, পরিবার, সহকর্মীদের সাথে যোগাযোগ রাখা থেকে শুরু করে খবর জানা, বিনোদন গ্রহণ – সবকিছুতেই এর ভূমিকা অনস্বীকার্য। কিন্তু সম্প্রতি ব্রিটেনের টেলিকম রেগুলেটর অফকম (Ofcom)-এর একটি নতুন রিপোর্ট এক ভিন্ন চিত্র তুলে ধরেছে। এই রিপোর্টে বলা হয়েছে, ব্রিটেনে প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যক্তিগত পোস্ট করার প্রবণতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। এই ফলাফল প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে, কারণ অনেকেই মনে করছেন এটি সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যবহারের এক বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত। প্ল্যাটফর্মগুলো যেভাবে শর্ট ভিডিও (Short Video) কন্টেন্টের দিকে ঝুঁকছে, তার সাথে এই পরিবর্তনের নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে।
অফকমের রিপোর্ট কী বলছে?
অফকমের সাম্প্রতিক ‘অডিট অফ অ্যাডাল্টস’ (Audit of Adults) রিপোর্টটি ব্রিটিশদের ডিজিটাল জীবনযাপনের উপর গভীর অন্তর্দৃষ্টি প্রদান করে। এই রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২২ সালের তুলনায় ২০২৩ সালে ব্রিটেনের প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে সোশ্যাল মিডিয়ায় ছবি, টেক্সট বা ভিডিও পোস্ট করার সংখ্যা হ্রাস পেয়েছে। এর মানে এই নয় যে মানুষ সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করা ছেড়ে দিয়েছে; বরং তাদের ব্যবহারের ধরণে একটি মৌলিক পরিবর্তন এসেছে। রিপোর্টটি উল্লেখ করেছে যে ব্যবহারকারীরা এখন কন্টেন্ট তৈরি করার চেয়ে কন্টেন্ট দেখতেই বেশি পছন্দ করছেন। অর্থাৎ, ‘ক্রিয়েটর’ (Creator) হওয়ার চেয়ে তারা ‘কনজিউমার’ (Consumer) হয়ে উঠছেন।
বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে এই প্রবণতা আরও স্পষ্ট। যদিও তারা সোশ্যাল মিডিয়ায় অনেক বেশি সময় ব্যয় করে, তবে তাদের নিজস্ব ব্যক্তিগত পোস্টের সংখ্যা কম। পরিবর্তে, তারা ইনফ্লুয়েন্সার (Influencer) বা অন্যান্য কন্টেন্ট ক্রিয়েটরদের ভিডিও দেখতেই বেশি আগ্রহী। ফেসবুক (Facebook), ইনস্টাগ্রাম (Instagram), স্ন্যাপচ্যাট (Snapchat)-এর মতো প্ল্যাটফর্মগুলোতে পোস্টের সংখ্যা কমে এলেও, টিকটক (TikTok) এবং ইউটিউব (YouTube)-এর মতো প্ল্যাটফর্মগুলোতে ভিডিও দেখার হার বেড়েছে। অফকমের তথ্য এই ধারণাকে আরও শক্তিশালী করে যে, সোশ্যাল মিডিয়া তার মূল ‘বন্ধু ও পরিবারের সাথে যুক্ত হওয়ার’ উদ্দেশ্য থেকে সরে এসে এক বিশাল বিনোদন কেন্দ্রে রূপান্তরিত হচ্ছে।
কেন ঘটছে এই পরিবর্তন? বিশেষজ্ঞরা কী বলছেন?
এই ব্যাপক পরিবর্তনের পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে বলে মনে করেন প্রযুক্তি ও সমাজ বিজ্ঞানীরা। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো শর্ট ভিডিও কন্টেন্টের অপ্রতিরোধ্য উত্থান।
শর্ট ভিডিওর জয়জয়কার
টিকটক-এর (TikTok) উত্থান সোশ্যাল মিডিয়ার ল্যান্ডস্কেপ (Landscape) সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছে। এর ক্ষুদ্র এবং দ্রুতগতির ভিডিও ফর্ম্যাট (Format) বিশ্বজুড়ে তরুণদের মন জয় করেছে। এই সাফল্যের পর ফেসবুকের মেটা (Meta) কোম্পানি তাদের ইনস্টাগ্রামে ‘রিলস’ (Reels) এবং ইউটিউব (YouTube) ‘শর্টস’ (Shorts) চালু করে। এই শর্ট ভিডিওগুলো দ্রুত বিনোদন দেয় এবং কম মনোযোগের সময়কালের (Attention Span) সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ব্যবহারকারীরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্ক্রল (Scroll) করে বিভিন্ন কন্টেন্ট দেখতে পারে।
তবে, এই ভিডিওগুলো তৈরি করা সাধারণ ব্যবহারকারীদের জন্য সবসময় সহজ হয় না। একটি মানসম্মত রিল বা টিকটক ভিডিও বানানোর জন্য ভালো এডিটিং (Editing), সাউন্ড (Sound) এবং আইডিয়া (Idea) প্রয়োজন, যা সবার পক্ষে সম্ভব নয়। ফলে, বেশিরভাগ ব্যবহারকারীই কন্টেন্ট তৈরি করার পরিবর্তে দর্শক হিসেবেই রয়ে যান।
‘পারফেক্ট লাইফ’ দেখানোর চাপ
এক দশক আগেও মানুষ তাদের দৈনন্দিন জীবনের সাধারণ মুহূর্তগুলো সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করত। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে সোশ্যাল মিডিয়া এক ‘পারফেক্ট লাইফ’ বা নিখুঁত জীবন দেখানোর প্রতিযোগিতার মঞ্চে পরিণত হয়েছে। ছুটির দিনের চমৎকার ছবি, দামি খাবার, ফ্যাশনেবল পোশাক – এই সবকিছুর মাধ্যমে যেন একটি ‘আদর্শ’ জীবন তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়। এর ফলে অনেক ব্যবহারকারীই নিজেদের জীবনকে অন্যের সাথে তুলনা করে হতাশ বোধ করেন। এই তুলনা এবং নিখুঁত দেখানোর চাপ থেকে বাঁচতে অনেকে ব্যক্তিগত পোস্ট করা কমিয়ে দিয়েছেন। সমাজবিজ্ঞানী ড. আনিকা রহমান বলেন, “মানুষ এখন বুঝতে পারছে যে সোশ্যাল মিডিয়ায় যা দেখানো হয়, তা সবসময় বাস্তব নয়। এই মানসিক চাপ এড়াতে তারা নিজেদের ব্যক্তিগত জীবন শেয়ার করা থেকে দূরে থাকছে।”
গোপনীয়তা এবং নিরাপত্তার উদ্বেগ (Privacy and Security Concerns)
গত কয়েক বছরে ডেটা সুরক্ষা (Data Security) এবং গোপনীয়তা নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে। বিভিন্ন ডেটা লিক (Data Leak) এবং ব্যক্তিগত তথ্য অপব্যবহারের ঘটনা মানুষকে সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করার ব্যাপারে আরও সতর্ক করেছে। অনেক ব্যবহারকারীই তাদের ব্যক্তিগত ছবি বা তথ্য অনলাইনে শেয়ার করতে দ্বিধা বোধ করছেন, কারণ তারা জানেন না সেই তথ্য কোথায় এবং কীভাবে ব্যবহার হতে পারে। এই উদ্বেগও পোস্টের সংখ্যা কমানোর একটি বড় কারণ।
অ্যালগরিদম (Algorithm)-এর প্রভাব
সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলোর অ্যালগরিদমও এই পরিবর্তনে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। প্ল্যাটফর্মগুলো এখন শর্ট ভিডিও কন্টেন্টকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে, কারণ এই ধরণের কন্টেন্টে ব্যবহারকারীদের ব্যস্ততা (Engagement) বেশি হয়। ইনস্টাগ্রাম বা ফেসবুকে একটি সাধারণ টেক্সট পোস্ট বা ছবির তুলনায় একটি রিল ভিডিওতে বেশি রিচ (Reach) এবং এনগেজমেন্ট পাওয়া যায়। ফলে, যারা নিয়মিত পোস্ট করতেন, তারাও দেখছেন তাদের কন্টেন্টে আগের মতো সাড়া মিলছে না। এই বিষয়টিও মানুষকে পোস্ট করা থেকে বিরত রাখছে।
ব্যবহারকারীর কার্যকলাপের পরিবর্তন: একটি তুলনামূলক চিত্র
অফকমের রিপোর্ট অনুযায়ী, ব্যবহারকারীদের সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারের ধরণে একটি স্পষ্ট পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। নিচের টেবিলে এই পরিবর্তনটি তুলে ধরা হলো:
| কার্যকলাপ (Activity) | পুরোনো প্রবণতা (Old Trend) | নতুন প্রবণতা (New Trend) |
|---|---|---|
| পোস্ট করা (Posting) | নিয়মিত ব্যক্তিগত ছবি ও টেক্সট | অনিয়মিত বা কম ব্যক্তিগত পোস্ট, বেশিরভাগই দেখা |
| দেখা (Viewing) | বন্ধু-বান্ধবদের ফিড দেখা | ইনফ্লুয়েন্সার, ক্রিয়েটর ও শর্ট ভিডিও দেখা |
| শেয়ার করা (Sharing) | পাবলিক (Public) বা বন্ধুদের সাথে | প্রাইভেট মেসেজিং (Private Messaging) বা ক্লোজ ফ্রেন্ডস (Close Friends) |
| বার্তা আদান-প্রদান (Messaging) | সরাসরি মেসেজ বা গ্রুপ চ্যাট | প্রচুর পরিমাণে ব্যক্তিগত মেসেজিং (ডার্ক সোশ্যাল) |
সোশ্যাল মিডিয়ার ভবিষ্যৎ: কোন দিকে যাচ্ছে?
এই পরিবর্তনগুলি সোশ্যাল মিডিয়ার ভবিষ্যতের উপর গভীর প্রভাব ফেলবে। প্ল্যাটফর্মগুলো এখন ব্যবহারকারীদেরকে কন্টেন্ট তৈরি করতে উৎসাহিত করার জন্য নতুন নতুন ফিচার (Feature) আনছে, কিন্তু এর ফল কতটা মিলবে তা এখনো স্পষ্ট নয়।
কিছু বিশেষজ্ঞ মনে করেন, সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলো ক্রিয়েটর ইকোনমি (Creator Economy)-এর দিকে আরও বেশি ঝুঁকবে। অর্থাৎ, অল্প কিছু কন্টেন্ট ক্রিয়েটর বিনোদনমূলক কন্টেন্ট তৈরি করবেন এবং বিশাল সংখ্যক ব্যবহারকারী তা উপভোগ করবেন। এটি হয়তো ঐতিহ্যবাহী মিডিয়ার মতোই একপেশে যোগাযোগ ব্যবস্থায় পরিণত হবে, যেখানে দর্শক এবং স্রষ্টার মধ্যে পার্থক্য আরও স্পষ্ট হবে।
অন্যদিকে, ‘ডার্ক সোশ্যাল’ (Dark Social)-এর উত্থানও লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এর মানে হলো, ব্যবহারকারীরা তাদের ব্যক্তিগত মুহূর্ত বা সংবেদনশীল তথ্য পাবলিক প্ল্যাটফর্মে শেয়ার না করে ব্যক্তিগত মেসেজিং অ্যাপ (Messaging App) যেমন হোয়াটসঅ্যাপ (WhatsApp), টেলিগ্রাম (Telegram) বা ইনস্টাগ্রাম ডিএম (Instagram DM)-এর মাধ্যমে শেয়ার করছেন। এতে করে কন্টেন্ট শেয়ারিং মোটেই কমছে না, বরং এটি একটি আরও ব্যক্তিগত এবং সুরক্ষিত চ্যানেলে স্থানান্তরিত হচ্ছে।
কমিউনিটি বিল্ডিং (Community Building) এবং ইন্টারেকশন (Interaction)-এর গুরুত্ব হয়তো কমছে না, কিন্তু এর পদ্ধতি পরিবর্তিত হচ্ছে। ছোট ছোট প্রাইভেট গ্রুপ, বিশেষ আগ্রহের উপর ভিত্তি করে কমিউনিটি বা ফোরামগুলো (Forum) এখন আরও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে। ফেসবুকও প্রাইভেট গ্রুপগুলোর উপর জোর দিচ্ছে, যা এই প্রবণতারই প্রতিফলন।
লং-ফর্ম কন্টেন্ট (Long-Form Content) যেমন বিস্তারিত লেখা বা দীর্ঘ ভিডিও হয়তো মূলধারার সোশ্যাল মিডিয়া থেকে ইউটিউব, ব্লগ (Blog) বা পডকাস্টের (Podcast) মতো প্ল্যাটফর্মে স্থানান্তরিত হবে। ইনস্টাগ্রাম বা টিকটকের ফিডে এখন আর দীর্ঘ পোস্টের তেমন জায়গা নেই।
উপসংহার
অফকমের রিপোর্টটি সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় নির্দেশ করে। ব্রিটেনে প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে ব্যক্তিগত পোস্টের সংখ্যা কমে যাওয়া এবং শর্ট ভিডিওর দিকে ঝুঁকে পড়ার প্রবণতা প্রমাণ করে যে ডিজিটাল দুনিয়া প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হচ্ছে। এই পরিবর্তন হয়তো আমাদের যোগাযোগের ধরণ, তথ্যের ব্যবহার এবং বিনোদনের পদ্ধতিকেও নতুন করে সংজ্ঞায়িত করবে। সোশ্যাল মিডিয়া এখন আর শুধু বন্ধুত্বের মঞ্চ নয়, এটি হয়ে উঠছে এক বিশাল বিনোদন ও তথ্য সংগ্রহের হাব। এই নতুন প্রবণতার সাথে মানিয়ে নিতে প্ল্যাটফর্মগুলোকেও নতুন কৌশল অবলম্বন করতে হচ্ছে এবং ব্যবহারকারীদেরও বুঝতে হবে যে, এই ডিজিটাল বিশ্বে তাদের ভূমিকা এখন কেবল একজন দর্শক হিসেবেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং কন্টেন্ট সচেতনভাবে নির্বাচন করা এবং ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা নিশ্চিত করাও তাদের দায়িত্ব।